৫৫ বছর পর ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশীপের মত কোন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেছিলো ইংল্যান্ড। যদিও ১২০ মিনিটের মাঠের লড়াই শেষে ট্রাইবেকারের চূড়ান্ত ফলাফলে ‘ফুটবল হোম এ না এসে চলে যায় রোম এ’। আর এই প্যানাল্টি শ্যূটÑআউটে যে তিন প্লেয়ার ব্যর্থ হন, তারা শিকার হন জঘন্য বর্ণবাদী আচরণের। জাতীয় দলের গৌরব গাঁথায় সারা দেশ যেখানে গর্বিত, ফাইনালে ওঠার উত্তেজনায় পুরো জাতি যেখানে টগবগ করে ফুটছে, পরাজয়ে অশ্রু ঝরলেও তাতে গ্লানি ছিলো না। তবে কতিপয় বর্ণবাদী দানবের আচরণে পুরো জাতি এখন গ্লানিতে পুড়ছে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এমআই ফাইভ এর প্রধান ইংলিশ ফুটবলারদের বিরুদ্ধে অনলাইনে বর্ণবাদী নির্যাতনের জন্য রাশিয়ানরা দায়ি বলে যে দাবি করা হচ্ছে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এই দায় নিজের দেশ বৃটেনকেই কাঁেধ তোলে নেয়া উচিত।
মঙ্গলবার ১৩ জুলাই রাতে এমআই-৫ এর প্রধান ক্যান ম্যাকলম বলেছেন, গত রোববার রাতের ইউরো ফাইনালের প্যানাল্টি মিস করা তিন ইংলিশ ফুটবলারের প্রতি অনলাইনে যে বর্ণবাদি নির্যাতন চালানো হয়, সেটা সিকিউরিটি সার্ভিসের কোন বিষয় ছিলো না। কারণ এগুলো বৈরী কোন রাষ্ট্র থেকে করা হয়নি।
তিনি বলেন, আমি আমরা নির্দিষ্ট সীমারেখা কিছুটা বাইরে গিয়েও যদি বলতে হয়, তাহলে বলবো যদি আমরা ভয়ংকর এই বর্ণবাদী আচরণের জন্য বিদেশীদের মাত্রাতিরিক্ত দোষারোপ করি, তাহলে নিজের দেশের গন্ডির মধ্যে আমাদের যে সমস্যা তার দায়ভার না নেয়ার ঝুকি আমরা তৈরী করছি।
এমআই ফাইভের লন্ডন হেডকোয়ার্টারে এক অনুষ্ঠানে তিনি তার গোয়েন্দা সহকর্মীদের সাথে তরুণ ফুটবলারদের তুলনা করে বলেন, একদল তরুণ দেশের জন্য তাদের সর্বস্ব উজাড় করে দিচ্ছে এবং আপনি সব সময়ই জিতবেন না।
এমআই-ফাইভ এর প্রধান বলেছেন, ব্রিটেনকে অবশ্যই ‘খাটের নিচে লুকানোর’ প্রবণতা পরিহার করতে হবে। বৈরী রাষ্ট্রগুলোর বহুস্তর বিশিষ্ট হুমকিকে মোকাবেলা করতে হবে যথাযথভাবে।
প্রধান মন্ত্রীর অফিস ডাউনিং স্ট্রিট থেকে বলা হয়েছে, জাতীয় দলের তিন খেলোয়াড় মার্কোস রাশফোর্ড, বুকাও সাকা এবং জ্যাডন সানচো ইউরো’র ফাইনালের পর অনলাইনে বর্ণবাদী আচরণের শিকার হওয়ার প্রেক্ষিতে ফুটবলে নিষিদ্ধ করার আইনী ক্ষমতায় অনলাইন রেসিজমকে অন্তর্ভূক্ত করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, যারা অনলাইনে বর্ণবাদী নিপীড়ন করেছে, তাদেরকে ফুটবল ম্যাচে নিষিদ্ধ করা হবে। হাউজ অব পার্লামেন্টে বুধবার বক্তৃতাকালে প্রাইমমিনিস্টার বলেন, বর্ণবাদী মন্তব্যকারীদের কোন ছাড় দেয়া হবে না। এই ধরনের ফ্যানরা আর মাঠে গিয়ে খেলা উপভোগ করতে পারবে না। এজন্য ফুটবল ব্যানিং ওর্ডার অর্থাৎ নিষিদ্ধকরণ আদেশে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে কোন ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ‘ছাড়’ এবং ‘অজুহাত’ নেই।
এদিকে রনিমেড ট্রাস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, বর্ণ বৈষম্য নিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশনের একাধিক শর্ত লঙ্ঘন করেছে বৃটেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ডে বর্ণবাদ এখনো পদ্ধতিগত এবং দেশটির সংবিধান, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং রীতিনীতিতেও এটি পাওয়া যায়। জাতিগত দিক দিয়ে সংখ্যালঘুরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বলেও ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে স্কাই নিউজ।
ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ডে ভিন্ন জাতিগত ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসারা স্বাস্থ্য, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা, চাকরি, অভিবাসন ও রাজনীতিতে বৈষম্যের শিকার হন। ইউরো ২০২০ ফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে তিনটি পেনাল্টি মিস করেন ইংলিশ ফুটবলার রাশফোর্ড, সাকা এবং সাঞ্চো। এরপরই তাদেরকে পরতে হয় সমর্থকদের বর্ণবাদী নানা মন্তব্যের মুখে। এর নিন্দা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল এবং প্রিন্স উইলিয়াম।
ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে প্রীতি প্যাটেলের ‘পুলিশ ক্রাইম এন্ড সেন্টেন্সিং বিল’ অভিবাসনের ক্ষেত্রে বেশি উদ্বেগজনক। এরফলে ছোট অপরাধের কারনেও পুলিশ চাইলে অভিবাসীদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দিতে পারবে। এটি জাতিসংঘের বর্ণবাদ বিরোধী কনভেনশনের শর্ত লঙ্ঘন। বৃটিশ সরকারকে নিয়মিত জাতিসংঘের কাছে রিপোর্ট প্রদান করতে হয় যাতে প্রমাণ হয় যে তারা ওই চুক্তিগুলো মেনে চলছে। তবে ২০২০ সালের রিপোর্ট কোভিড মহামারির কারণে প্রদান করা হয়নি। রনিমেড এখন জানাচ্ছে, ইংল্যান্ডে সাম্প্রতিক সময়ে বর্ণবাদী হামলার ঘটনা বেড়েছে।















